×
  • আপডেট টাইম : 30/04/2018 03:20 AM
  • 55 বার পঠিত
নিজস্ব প্রতিনিধি:- ‘আমি সব সময় ওভারব্রিজ দেয়া পার অই। কিন্তু হেইদিন অনেক মানুষ রাস্তা পারাইতাছে দেইখ্যা আমিও পার হওনের চেষ্টা করি। এই কাজ না করলে আইজ আমার এই সর্বনাশ হইত না।’ ২০ এপ্রিল রাজধানীর বনানীতে দুর্ঘটনার পরদিন পঙ্গু হাসপাতালে শুয়ে আক্ষেপের কথা বলেছিলেন রোজিনা। আগের সন্ধ্যায় বনানী সৈনিক ক্লাব থেকে মহাখালীর মাঝামাঝি এলাকায় একটি ফুটওভারব্রিজ থাকলেও নিচ দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হতে গিয়েছিলেন রোজিনা। তার সঙ্গে অনেকেই এই কাজ করেছেন। অন্যরা নিরাপদে পার হলেও রোজিনার একটি পা চলে যায় বিআরটিসির দ্রুতগামী বাসের চাকার নিচে। আর বাসটি চালিয়ে যাওয়ার পর ভারী চাকা ডান পা বিচ্ছিন্ন করে দেয় এই তরুণীর। স্থানীয়রা ধরাধরি করে মেয়েটিকে নিয়ে যায় পঙ্গু হাসপাতালে। পরে সেখান থেকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দুর্ঘটনার নয় দিন পর মৃত্যু হয় রোজিনার। মেয়েটির মৃত্যুর ঘটনাটি যে মানুষকে ছুঁয়ে গেছে, সেটি সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট। এই ঘটনায় পথচারীরা কতটুকু শিক্ষা নেবে? অন্যান্য দিনের মতো রোজিনার মৃত্যুর দিনও ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও বনানীর সেই এলাকায় দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি দেখা গেছে। একাধিক পথচারীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে বিব্রত হাসি দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে যান তারা। একই চিত্র দেখা গেছে সৈনিক ক্লাব থেকে বনানীর দিকে থাকা ফুটওভারব্রিজ এবং কাকলী মোড়ে ফুটওভারব্রিজে। সেখানেও পথচারীরা দ্রুতগামী গাড়ির দিকে হাত উঁচিয়ে দৌড়ে কোনো রকমে কায়দা কসরত করে রাস্তা পারাপার হচ্ছিলেন। রোজিনার মতো এমন মৃত্যু রাজধানীতে বিরল নয়। প্রতি বছরই কেউ না কেউ এভাবে রাস্তা পার হতে গিয়ে জীবন দিচ্ছেন, কেউ হারাচ্ছেন অঙ্গ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে নগরবিদ আর পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বারবার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে, সচেতন করতে নানা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই যেন পথচারীদের। রাজধানীর কারওয়ানবাজার মোড়ে নিত্যদিন দেখা যায় একটি চিত্র। গাড়ির সিগন্যাল বন্ধ নেই। দ্রুতগতিতে পার হচ্ছে বাস, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ সবধরনের যান্ত্রিক যান। এর মধ্যেই একদল মানুষ এক হয়ে হাঁটা শুরু করবে। গাড়িও চলতে থাকবে, এর মধ্যেই পার হবে মানুষের স্রোত। আর যিনি শেষ দিকে থাকেন এবং প্রথম দিকে থাকেন, তার ঝুঁকিটাই থাকে সবচেয়ে বেশি। আড়াআড়ি রাস্তা পার হওয়া ঠেকাতে কোথাও সড়ক বিভাজকে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে, তার কোথাও কোথাও দেখা যাবে বেড়ার মধ্যে একটি গোল হয়ে ফাঁকা হয়ে আছে একটি অংশ। তাঁর উঁচিয়ে ভেতর দিয়ে যেতে যেতে এই দশা হয়েছে। নিউ মার্কেট এলাকায় লোহার শিক ভেঙে বা খুলে ফেলেছে ওভারব্রিজ দিয়ে পার হতে অনীহা দেখানো মানুষেরা। অদ্ভুত কায়দা কসরতে এভাবে পার হওয়ার ছবি প্রায়ই হাস্যরস তৈরি করে। কিন্তু তাতে প্রবণতা কমে না এতটুকু। আর সবচেয়ে ভীতিকর চিত্র দেখা যাবে বিমানবন্দর সড়কের খিলক্ষেত পার হয়ে কিছুটা আগালে। রাজধানীর অন্য যেকোনো সড়কের তুলনায় এই সড়কে গাড়ির গড়ি থাকে অনেক বেশি। কখনও কখনও সেটি থাকে একশ কিলোমিটারেরও বেশি। এর মধ্যেই হাত উঁচিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হতে দেখা যায় নিত্য দিন। এভাবে রাস্তা পার হওয়া ঠেকাতে নগরীর অন্য যেকোনো এলাকার তুলনায় এখানে সড়ক বিভাজকও অনেক উঁচু। কিন্তু এই বাঁধাও আটকাতে পারছে না বহু মানুষকে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কখনও ঘটা করে, কখনও এলাকাভিত্তিক, কখনও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালে ঝটিকা। ২৮ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিশেষ সচেতনতামূলক প্রচার কর্মসূচি উদ্বোধন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। গত ১৮ এপ্রিল গুলশান কাকলী ক্রসিংয়ে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করায় বেশ কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়। অভিযান চালানো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মশিউর রহমান বলেন, ‘ট্রাফিক আইন সর্ম্পকে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ ছিল। ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ট্রাফিক উত্তর বিভাগ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযান আরও জোরদার করবে।’ র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম ছাড়া ক্ষতি হয় না এটা বুঝতে হবে।’ ‘মাঝে মাঝে নিয়ম করে বা জরিমানা করে কখনও এটা বন্ধ করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে মিডিয়া একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া আমাদের বিভিন্ন বাহিনীসহ সরকার তো কাজ করছেই।’ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র এআরআই এর চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, ‘এটা একটা মব কালচারে পরিণত হয়েছে। সুস্থ, স্বাভাবিক, মানুষও যখন এভাবে পার হয়, সেটা দেখে অন্যরাও তাই করে।’ এ থেকে উত্তরণের কি কোনো উপায় নেই?- এমন প্রশ্নে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমাদের পাঠ্য বইতে সড়কে চলাচল নিয়ে তেমন কোনো কিছু শেখানো হয় না। ফলে অনেকে জানে না বিষয়গুলো কী।  বাকি দুই একজন যারা জানে পরবর্তী সময় হয়ত সেকেন্ডারিভাবে শিখেছে। প্রাইমারি শিক্ষাটা যেভাবে একটা মানুষের উপরে ইফেক্ট ফেলে সেটা কখন পরে শিখলে ইফেক্ট ফেলে না।’ ‘ফুটওভার ব্যবহার ও রাস্তার পারাপার নিয়ে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।  প্রয়োজনে টেলিভিশনের প্রচার করতে হবে। কারণ, নগর জীবন কিন্তু নিয়মকানুন ছাড়া চলে না। সরকারি সংস্থাগুলো এগুলো আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিছে।’ ‘এটাকে অবশ্যই প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অবশ্যই পাঠ্যপুস্তকে নিয়ে আসতে হবে, আরবান এরিয়ার (নগর) জীবনযাত্রা কীভাবে চলে।’ ‘বাইরের দেশগুলোতে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশকে বিভিন্ন স্কুলে ট্রেনিং দেওয়া হয়। এমনকি পুলিশ স্টেশনগুলোতে খেলনার মতো করে সাজানো থাকে নিয়মকানুনগুলো যেখানে স্কুলের বাচ্চারা গিয়ে নিয়ম শিখে থাকে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

ফেসবুকে আমরা...