স্টাডি বাডি: বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের অনলাইন সেবাকেন্দ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: 29/06/2020 08:31:18 am

সংগঠন বা কোম্পানির গোড়াপত্তনের ইতিহাস যেমন অনেক কঠিন মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক, তেমনি চ্যালেঞ্জিং ও অনুপ্রেরণামূলক। যারা নানা সমস্যার মধ্যে সম্ভাবনার দ্বার খুঁজে বেড়ায় অবিরত, তারাই এক সময় সব বাঁধা পেরিয়ে পৌঁছে যায় সাফল্যের অনন্য উচ্চতায়।

তেমনি আজ একজন স্বপ্নবাজ, পরিশ্রমী মানুষের গল্প শোনাবো। যার আজকের এই সফলতার পেছনে রয়েছে বেদনাদায়ক কিছু গল্প।

নাম শেখ ইনজামাম। তার গ্রামের বাড়ি যশোর, বাবার নাম শেখ মো. আখতারুজ্জামান, মা হাসিনা ইয়াসমিন। তারা দুই ভাইবোন ছিলেন। একমাত্র বোন সেই ছোটবেলাই মারা গেছেন।

তার আপন বড় বোনের নাম ছিল হামিদা আশরাফী। তার চেয়ে ১৪ মাসের বড় এই বোন। এক সময় হামিদা মারাত্মক লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটিতে আক্রান্ত হয়। পরিবারের সবাই বিশেষ করে বাবা-মা দুশ্চিন্তা নিয়ে সন্তানের রোগমুক্তির জন্য নিরন্তর ছুটাছুটি করেন। দেশের সর্বত্র ধরনা দিয়ে সর্বশেষ বিদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসকের দ্বারস্থ হোন। তাতেও শেষ পর্যন্ত বিফল হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

শেষ পর্যন্ত গত এক বছর পূর্বে বোন হামিদা ফুসফুসের প্রদাহজনিত কারণে মারা যান। পরবর্তী সময়ে এ রোগে আক্রান্ত আরও কিছু বাচ্চার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ইনজামামের। সেই একই তিক্ত বিষাক্ত অভিজ্ঞতার পূনরাবৃত্তি। শাশ্বত মানবিক সত্তার তাগিদে এ রোগে আক্রান্তদের জন্য কিছু করার ক্ষুধিত মনোবাসনা ও দৃঢ়সংকল্প থেকেই কাজ করা শুরু করেন।

সেই স্বপ্ন থেকেই একটা প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়, যার নাম ‘স্টাডি বাডি’ (অল্টারনেটিভ লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ফর কিডস উইথ লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটিস)।

লানিং ডিজঅ্যাবিলিটি হচ্ছে, মূলত মানব মস্তিষ্কের অংশবিশেষের অপরিপক্কতা ও দূর্বলতা। স্নায়ুতন্ত্রের ত্রুটিযুক্ত গঠনপ্রণালীর কারণে এটা হয়ে থাকে। যা শেখার প্রবণতা ও সক্ষমতা খর্ব করার সাথে সাথে তথ্য-উপাত্ত আয়ত্ত করা, প্রক্রিয়াজাত বা সারাংশ উপলব্ধি করা, একটা সময়ব্যাপী স্মরণশক্তিতে ধরে রাখা নষ্ট করে দেয়। কোনো সহজ বিষয় সহজে বুঝতে পারাকে বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্তও করে দেয় এ ব্যাধি। এক সময় শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে বিমুখী করে তোলে। তবে লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটির প্রকট ও সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে পড়তে ও লিখতে অপারগ/অসমর্থ হওয়া। স্মরণশক্তির মারাত্মক ঘাটতি এবং কোনো কিছু/বিষয় দেখে ও শুনেও তা মোটেই বুঝতে না পারা। যদিও এটা চোখ ও কানের কোনো ত্রু টি নয়।

ডিজঅ্যাবিলিটি/লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটির প্রভাব সম্পর্কে স্বপ্নবাজ এই তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, ‘সামাজিক দৃষ্টিতে লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটিসহ সব ধরনের ডিজঅ্যাবিলিটিকে ব্যক্তি বিশেষের অপকর্মের/অভিশাপের প্রতিফল হিসেবে দেখা হয়। ডিজঅ্যাবিলিটিতে আক্রান্ত শিশু/ব্যক্তির বাবা-মাকে ঘৃণার পাত্র হিসেবে দেখা হয় পারিবারিক ও সামাজিকভাবে। অথচ এটি একটি সাধারণ ব্যাধির মতো। যেকেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।’

‘স্টাডি বাডি’ মূলত লার্নিং ডিজঅ্যাবল শিশুদের সেবার সুমহান ব্রত নিয়ে প্রতিষ্টিত একটি সংগঠন। যেখানে প্রতিবন্ধী বাচ্চা, তাদের পিতা-মাতা এবং শিক্ষক এই তিনটি স্তরকে সমন্বিত ও সম্পৃক্ত করে  কার্য্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। শুধু একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটি সুসংগঠিত হয়েছে। আর তা হলো প্রতিবন্ধি বাচ্চাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি অনুরাগী করা। তাদের অন্যসব সুস্থ্য-সবল বাচ্চাদের মতো যুগোপযোগী শিক্ষায় সুশিক্ষিত ও সুপ্রশিক্ষিত করে তোলা। আত্মনির্ভরশীল হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে পরিবার ও দেশ ও জাতির সম্পদ হিসেবে তৈরি করে দেওয়া। এ লক্ষ্য অর্জনে যা যা করার প্রয়োজন, তার সবই করে থাকে ‘স্টাডি বাডি’।

সাধারণত ৩ বছর থেকে শুরু করে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের সেবা প্রদান করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। লার্নিং ডিজঅ্যাবল বাচ্চাদের মনন ও মস্তিষ্কের সাথে সামঞ্জস্য উপযোগী কনটেক্সটচুয়ালাইজড টুলস ও রির্সোস তৈরি করা। যেমন অগমেন্টেড রিয়েলিটি বুকস, আইওটি হার্ডওয়্যার এবং গেমস, যার যথোপযুক্ত প্রয়োগ ও ব্যবহারে তাদের মস্তিষ্কের ত্রুটিযুক্ত অংশে উদ্দীপনা সঞ্চারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের মস্তিষ্ককে পূর্ণ কর্মক্ষম করে তোলা। তারা অপরাপর সুস্থ্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো সাবলীলভাবে পড়াশোনায় অগ্রগতি অর্জনে সমর্থ হয়।

তাদের এসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানগর্ভ পরিসেবাসমূহ ‘স্টাডিবাডি অ্যাপ’-এ পাওয়া যাচ্ছে। যা ‍গুগল প্লে-স্টোর থেকে একটি স্মার্ট ডিভাইসের সাহায্যে যেকোনো স্থান থেকে যেকোনো সময় ডাউনলোড করে ব্যবহার করা যায়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এগুলো সহজলভ্য নয়। এছাড়াও দেশে হাতে গোনা যে কয়টি বিশেষ স্কুল রয়েছে লার্নিং ডিজঅ্যাবল বাচ্চা/শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত শিক্ষা ও সেবা প্রদানের জন্য, সেগুলোর ভর্তি ফি ও মাসিক খরচ অনেক। এত খরচ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বহন করাও সম্ভব নয়।

উদ্যোক্তা ইনজামাম বলেন, ‘সব মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আমাদের সেবাগুলোকে সম্পূর্ণরূপে অনলাইনভিত্তিক করেছি। এতে করে সবাই স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করে বাসা বা স্কুল বা যেকোনো স্থান থেকে যেকোনো সময় আমাদের পরিসেবাসমূহকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারবেন।’

এই উদ্যোমী তরুণ স্বপ্ন দেখেন, তার প্রতিষ্ঠান একদিন ‘পরিবার ও সমাজের চোখে অবহেলিত, ঘৃণিত প্রতিবন্ধী শিশুদের সমাজের কাছে মহামূল্যবান করে গড়ে তুলবে। শিশুদের পিতা-মাতাকে সমাজে ধিক্কার থেকে রেহাই দেবে।’

‘ধীরে ধীরে আমাদের পরিষেবাকে সামাজিক আন্দোলনের আদলে দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেবো। এভাবেই আমাদের দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল হবে’, বলেন তিনি।

লেখক: তরুণ উদ্যোক্তা।